বাংলাদেশের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাব্যবস্থা পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে-
ড. না. আদদ্বীন ,
বাংলাদেশের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাব্যবস্থা বহু দশক ধরে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি কেন্দ্রীয় অংশ। এর শিকড় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবর্তিত পরীক্ষানির্ভর শিক্ষা কাঠামোর মধ্যে নিহিত, যা পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশেও অব্যাহত রয়েছে। একসময় এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল সারা দেশে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অভিন্ন ও মানসম্মত মূল্যায়ন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কিন্তু পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতায় এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
বিশ্বের অনেক উন্নত ও সফল শিক্ষাব্যবস্থা, বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা, বাংলাদেশের মতো জাতীয় পর্যায়ের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষার ওপর নির্ভরশীল নয়। সেখানে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয় ধারাবাহিক ক্লাস পারফরম্যান্স, কোর্স ক্রেডিট, প্রকল্পভিত্তিক কাজ, ব্যবহারিক দক্ষতা এবং স্কুলভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে। একটি বা দুটি পরীক্ষার ওপর পুরো শিক্ষাজীবনের সাফল্য নির্ধারণ করা হয় না। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যও বাধ্যতামূলক গ্র্যাজুয়েশন পরীক্ষা থেকে সরে এসেছে, কারণ এসব পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এবং প্রকৃত শিক্ষার মান উন্নয়নে সীমিত ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের মতো দেশে একযোগে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর জন্য জাতীয় পাবলিক পরীক্ষা আয়োজন করা অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল কাজ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরাঞ্চল পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা, মানসম্পন্ন শিক্ষক, নিরপেক্ষ পরীক্ষার পরিবেশ, নিরাপদ পরিবহন ও পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করা বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন। ফলে সকল শিক্ষার্থী একই প্রতিযোগিতামূলক মঞ্চে সমানভাবে অংশ নিচ্ছে—এ দাবি অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, অতিবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রায়ই শিক্ষা কার্যক্রমকে ব্যাহত করে। দুর্যোগপ্রবণ এলাকার শিক্ষার্থীরা বছরের পর বছর ক্লাস ও পড়াশোনায় ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তবুও তাদেরকে একই প্রশ্নপত্রে, একই সময়ে এবং একই মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হয়। ফলে বাস্তবিক অর্থে একটি বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো অতিরিক্ত মানসিক চাপ। একজন শিক্ষার্থীকে কয়েক বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়ে মাত্র কয়েক দিনের পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়। পরীক্ষার দিনে সামান্য অসুস্থতা, পারিবারিক সমস্যা কিংবা মানসিক চাপও তার ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে। এই চাপ থেকে উদ্বেগ, হতাশা, আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং কিছু ক্ষেত্রে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটে। তাই পরীক্ষাব্যবস্থার মানসিক স্বাস্থ্যগত প্রভাবকে আর উপেক্ষা করা যায় না।
এছাড়া বর্তমান পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা মুখস্থবিদ্যাকে উৎসাহিত করে। একজন শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব, যোগাযোগ দক্ষতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি বা বাস্তব সমস্যা সমাধানের ক্ষমতার চেয়ে পরীক্ষায় লিখিত উত্তরের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী জ্ঞান অর্জনের জন্য নয়, বরং নম্বর পাওয়ার জন্য পড়াশোনা করে।
কোচিং নির্ভরতা এই ব্যবস্থার আরেকটি নেতিবাচক দিক। ভালো ফলাফলের আশায় বিপুলসংখ্যক পরিবারকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফলে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষাগত বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পায়। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের চেয়ে কোচিং সেন্টার বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
একই সঙ্গে এই পরীক্ষাব্যবস্থা বিশাল প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করে। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মুদ্রণ, পরিবহন, নিরাপত্তা, পরীক্ষাকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, খাতা মূল্যায়ন এবং ফল প্রকাশ—সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল প্রক্রিয়া। সামান্য একটি ভুল বা প্রশ্নফাঁস পুরো দেশের শিক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
প্রধান চ্যালেঞ্জ ও নেতিবাচক প্রভাব
১. অতিরিক্ত মানসিক চাপ
প্রভাব:
- উদ্বেগ ও বিষণ্নতা
- ব্যর্থতার ভয়
- ঘুমের সমস্যা
- পরিবার ও সমাজের চাপ
- খারাপ ফলাফলের পর আত্মবিশ্বাস হারানো
২. মুখস্থনির্ভর শিক্ষা
প্রভাব:
- সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা হ্রাস
- সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তির বিকাশে বাধা
- ব্যবহারিক শিক্ষার গুরুত্ব কমে যাওয়া
- জ্ঞানের পরিবর্তে নম্বরকেন্দ্রিক পড়াশোনা
৩. কোচিং নির্ভরতা
প্রভাব:
- পরিবারের আর্থিক চাপ বৃদ্ধি
- শিক্ষাগত বৈষম্য বৃদ্ধি
- বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্ব কমে যাওয়া
৪. বিশাল প্রশাসনিক জটিলতা
প্রভাব:
- সরকারের উচ্চ ব্যয়
- প্রশাসনিক ভুলের ঝুঁকি
- ফল প্রকাশ ও ভর্তি কার্যক্রমে বিলম্ব
৫. প্রশ্নফাঁসের ঝুঁকি
প্রভাব:
- জনসাধারণের আস্থা কমে যাওয়া
- কিছু শিক্ষার্থীর অন্যায্য সুবিধা লাভ
- পরীক্ষা বাতিল বা পুনঃনির্ধারণের সম্ভাবনা
৬. প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব
প্রভাব:
- বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়া
- পরীক্ষাকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া
- প্রস্তুতিতে বাধা সৃষ্টি
- যাতায়াত সমস্যা
- পরীক্ষা পেছানো
- দুর্যোগপ্রবণ এলাকার শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত ক্ষতি
৭. সেশন জট
প্রভাব:
- বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বিলম্বিত হওয়া
- স্নাতক সম্পন্ন করতে বেশি সময় লাগা
- কর্মজীবনে প্রবেশে দেরি হওয়া
- জাতীয় উৎপাদনশীলতার ক্ষতি
৮. নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমে বিঘ্ন
প্রভাব:
- পাঠদানের সময় নষ্ট হওয়া
- সিলেবাস শেষ করতে বিলম্ব
- অন্যান্য শিক্ষার্থীর শিক্ষার সুযোগ কমে যাওয়া
৯. শিক্ষাগত বৈষম্য
প্রভাব:
- গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের অসুবিধা
- মানসম্পন্ন শিক্ষক ও শিক্ষা উপকরণে অসম প্রবেশাধিকার
- প্রকৃত মেধার পরিবর্তে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার প্রতিফলন
১০. একদিনের পারফরম্যান্সে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ
প্রভাব:
- পরীক্ষার দিনে অসুস্থতা মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে
- পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সংকট ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে
- বহু বছরের শিক্ষা কয়েক ঘণ্টার পরীক্ষায় মূল্যায়িত হয়
সংস্কারের প্রয়োজন
বাস্তবতা হলো, এসএসসি ও এইচএসসি সনদ একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত দক্ষতা, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব, যোগাযোগ ক্ষমতা, ব্যবহারিক জ্ঞান কিংবা কর্মক্ষেত্রে সফল হওয়ার সামর্থ্য সম্পর্কে সীমিত তথ্য প্রদান করে। আধুনিক বিশ্বে নিয়োগকর্তারা ক্রমেই শুধুমাত্র পরীক্ষার ফলাফলের চেয়ে দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তাই সময় এসেছে বিকল্প মডেল নিয়ে গুরুত্বসহকারে ভাবার। সম্ভাব্য সংস্কারের মধ্যে থাকতে পারে—
- স্কুলভিত্তিক মূল্যায়ন
- ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতি
- প্রকল্পভিত্তিক কাজ
- ব্যবহারিক পরীক্ষা
- শ্রেণিকক্ষের পারফরম্যান্স
- জাতীয় মানদণ্ড বজায় রেখে আঞ্চলিক বা স্থানীয় পরীক্ষা
এ ধরনের পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাবে, তাদের প্রকৃত দক্ষতা মূল্যায়নে সহায়তা করবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত বৈষম্য হ্রাস করবে এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক করে তুলবে।
শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল পরীক্ষার ফলাফল তৈরি করা নয়; বরং জ্ঞানী, দক্ষ, সৃজনশীল, আত্মবিশ্বাসী এবং মানবিক নাগরিক গড়ে তোলা। বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে চিন্তা করা, খোলামেলা আলোচনা শুরু করা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা সময়ের দাবি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়সঙ্গত এবং দক্ষতাভিত্তিক করার বিকল্প নেই।
লেখক:
ড. না. আদদ্বীন ,
অধ্যাপক , গবেষক, কলামিস্ট