যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি শিক্ষার্থী হিসেবে নিরাপদ থাকার উপায়

সাম্প্রতিক ঘটনায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
সাম্প্রতিক কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও তরুণের মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের সবাইকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে—অফ-ক্যাম্পাস সহিংসতা, ডাকাতি, রুমমেট–সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে পুলিশের সাথে ঘটে যাওয়া প্রাণঘাতী ঘটনা ।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের অন্যতম সেরা উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হলেও এটি একটি বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশ, যেখানে নিরাপত্তার অবস্থা শহরভেদে ও এলাকা ভেদে ভিন্ন। অধিকাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নিরাপদেই পড়াশোনা শেষ করেন; তবে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য, স্থানীয় আইন ও পরিবেশ সম্পর্কে অজ্ঞতা অনেক সময় ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তাই যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার প্রস্তুতির একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা।
বাস্তবতা বোঝা জরুরি: ঝুঁকি আছে, তবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য
যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস আশপাশের এলাকার তুলনায় তুলনামূলক নিরাপদ। এফবিআই ও যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পাসে সহিংস অপরাধ তুলনামূলক কম; তবে চুরি বা সম্পত্তি–সংক্রান্ত অপরাধ বেশি দেখা যায়।
কিন্তু বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের যেসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, তার বড় একটি অংশ ঘটেছে অফ-ক্যাম্পাসে, যেমন:
- তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস
- গভীর রাতে একা চলাফেরা বা কাজ
- রুমমেট বা পরিচিত ব্যক্তির সাথে বিরোধ
- ডাকাতি বা গুলিবর্ষণের মতো সহিংস অপরাধ
এ থেকে বোঝা যায়, শুধু ক্যাম্পাস নিরাপত্তার ওপর নির্ভর না করে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও জীবনযাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১. বাসস্থান ও এলাকা বাছাইয়ে সতর্ক হোন
অফ-ক্যাম্পাসে বসবাস করার আগে:
- স্থানীয় পুলিশ বা এফবিআইয়ের Crime Data Explorer–এর মাধ্যমে এলাকার অপরাধ পরিসংখ্যান দেখুন
- অস্বাভাবিকভাবে সস্তা ভাড়ার বাসা এড়িয়ে চলুন
- যেখানে বেশি শিক্ষার্থী থাকে এবং গণপরিবহন সুবিধাজনক—এমন এলাকা বেছে নিন
যুক্তরাষ্ট্রে Clery Act অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ক্যাম্পাস ও আশপাশের অপরাধের তথ্য প্রকাশ করতে হয়—এগুলো পর্যালোচনা করা জরুরি 6।
২. রুমমেট নির্বাচনে বিশেষ সতর্কতা
কয়েকটি সাম্প্রতিক ঘটনায় দেখা গেছে, ভুক্তভোগীরা অপরিচিত বা আংশিক পরিচিত রুমমেটের দ্বারাই ক্ষতির শিকার হয়েছেন 12।
করণীয়:
- অচেনা ব্যক্তির সাথে তড়িঘড়ি বাসা শেয়ার করবেন না
- আক্রমণাত্মক আচরণ, মাদকাসক্তি বা অস্থিরতার লক্ষণ দেখলে সরে আসুন
- দ্বন্দ্ব বাড়লে দ্রুত বাসা পরিবর্তন করুন এবং প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়কে জানান
- “ভদ্রতা” বা সাংস্কৃতিক সংকোচের কারণে ঝুঁকি নেবেন না—নিজের অন্তর্দৃষ্টি বিশ্বাস করুন
৩. গভীর রাতে চলাচল ও কাজের ঝুঁকি কমান
ডাকাতি–সংক্রান্ত একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে রাতে একা চলাচল বা কাজের সময় 3।
সতর্কতা:
- সম্ভব হলে রাতে একা হাঁটা এড়িয়ে চলুন
- বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল বা নির্ভরযোগ্য রাইডশেয়ার ব্যবহার করুন
- রাতে কাজ থাকলে কাউকে জানিয়ে রাখুন
- মোবাইল চার্জ ও জরুরি নম্বর সংরক্ষিত রাখুন
৪. পুলিশের সাথে যোগাযোগে সতর্ক আচরণ
যুক্তরাষ্ট্রে আইন প্রয়োগের নিয়ম কঠোর। বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের সময় ভুল বোঝাবুঝি বিপজ্জনক হতে পারে—এমন উদাহরণ আছে বাংলাদেশি তরুণদের ক্ষেত্রেও 7।
জরুরি নির্দেশনা:
- শান্ত থাকুন, হাত দৃশ্যমান রাখুন
- তর্ক বা হঠাৎ দৌড়াবেন না
- মানসিক সংকট থাকলে আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সেলিং ও ক্রাইসিস সেবা সম্পর্কে জানুন
৫. বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা সুবিধা ব্যবহার করুন
মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাধারণত থাকে:
- ক্যাম্পাস পুলিশ
- জরুরি কল বক্স
- নাইট এস্কর্ট সার্ভিস
- জরুরি এসএমএস এলার্ট
এসব ব্যবস্থা সঠিকভাবে ব্যবহার করলে ঝুঁকি অনেক কমে 56।
৬. একা হয়ে যাবেন না—সংযুক্ত থাকুন
একাকীত্ব ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভাষা ও সাংস্কৃতিক কারণে সাহায্য চাইতে দ্বিধা করেন।
করুন:
- বাংলাদেশি বা আন্তর্জাতিক স্টুডেন্ট সংগঠনে যুক্ত হন
- পরিবার ও বন্ধুদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন
- হুমকি, হয়রানি বা বৈষম্য হলে দ্রুত রিপোর্ট করুন
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আইনগতভাবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দিতে বাধ্য।
৭. স্থানীয় আইন ও সংস্কৃতি বুঝে নিন
যেসব বিষয় যুক্তরাষ্ট্রে দ্রুত জটিলতা তৈরি করতে পারে:
- উত্তপ্ত তর্ক বা শারীরিক বাকবিতণ্ডা
- অ্যালকোহল ও মাদক–সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘন
- ভাড়াটিয়া অধিকার ও জরুরি পরিস্থিতিতে কার সাথে যোগাযোগ করতে হবে—না জানা
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য এসব বিষয়ে বিস্তৃত নিরাপত্তা নির্দেশনা উপলব্ধ আছে ।
সচেতনতা মানেই সুরক্ষা
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মৃত্যু আমাদের জন্য সতর্কবার্তা, কিন্তু ভয়ের কারণ নয়। অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিরাপদেই পড়াশোনা শেষ করেন। পার্থক্য তৈরি করে সচেতনতা, প্রস্তুতি এবং সময়মতো পদক্ষেপ।
নিরাপদ বাসস্থান নির্বাচন, ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি এড়ানো, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ ব্যবহার এবং সামাজিকভাবে সংযুক্ত থাকার মাধ্যমে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। জীবন অমূল্য—নিরাপত্তাকে সবসময় অগ্রাধিকার দিন।
লেখক,
ড. না. আদদ্বীন
Dr. N. Uddin
অধ্যাপক, গবেষক