Blog

এস ডি জি (SDG) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ সরকারের করণীয়- ড. না. আদদ্বীন

আগামী পাঁচ বছরে (২০২৬-২০৩০) টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনে বাংলাদেশের করণীয়- ড. না. আদদ্বীন 

ভূমিকা

২০১৫ সালে জাতিসংঘের ২০৩০ এজেন্ডা গ্রহণের পর থেকে বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দারিদ্র্য হ্রাস, বিদ্যুৎ সুবিধার সম্প্রসারণ, শিক্ষায় লিঙ্গসমতা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের সাফল্য দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় প্রশংসনীয়। তবে সাম্প্রতিক মূল্যায়নগুলো দেখায় যে অনেক ক্ষেত্রে অগ্রগতি অসম এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূচকে স্থবিরতা বা পশ্চাৎগতি দেখা যাচ্ছে—বিশেষ করে বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন, সুশাসন ও জনসেবার মানের ক্ষেত্রে।

২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনের জন্য হাতে আছে মাত্র পাঁচ বছর। একই সঙ্গে ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে এখনই দ্রুত, সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে কেউ পিছিয়ে না পড়ে।

১. অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কর্মসংস্থানভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জোরদার করা (SDG 1, 8, 10)

গত এক দশকে বাংলাদেশ কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্যের বাইরে নিয়ে আসলেও ২০১৬ সালের পর দারিদ্র্য হ্রাসের গতি কমেছে এবং আয় বৈষম্য বেড়েছে। এখনও দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ অর্থনৈতিক বা জলবায়ুজনিত ধাক্কায় পুনরায় দারিদ্র্যে পতিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের জন্য। তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও সবুজ শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা, অনানুষ্ঠানিক খাতকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিসর বাড়ানো অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত জরুরি।

২. শিক্ষার মান ও ভবিষ্যৎমুখী দক্ষতা উন্নয়ন (SDG 4, 8, 9)

বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় সার্বজনীন ভর্তির হার এবং লিঙ্গসমতা অর্জন করলেও শিক্ষার গুণগত মান ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে দক্ষতার সামঞ্জস্য এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার বেশি এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ দুর্বল।

এসডিজি অর্জনের জন্য এখন শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের পাশাপাশি মানোন্নয়নের দিকে জোর দিতে হবে। পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (TVET) সম্প্রসারণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার এবং প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও স্বাস্থ্য খাতে দক্ষতা উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সরকারি–বেসরকারি অংশীদারিত্ব কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

৩. স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংস্কার ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি (SDG 3)

বাংলাদেশে গড় আয়ু ও মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার উন্নত হলেও স্বাস্থ্য খাত এখনও পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও দক্ষ জনবলের অভাবে ভুগছে। উচ্চ ব্যক্তিগত ব্যয়, গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার সীমিত প্রাপ্যতা এবং অসংক্রামক রোগের বৃদ্ধি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আগামী পাঁচ বছরে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ানো, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা এবং স্বাস্থ্য বীমা বা ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ স্বাস্থ্যসেবাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে পারে।

৪. জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত সংকট মোকাবিলা (SDG 6, 11, 13, 14, 15)

জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ও বহুমাত্রিক হুমকি। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও তাপপ্রবাহ জীবিকা, খাদ্য নিরাপত্তা ও নগর অবকাঠামোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যথাযথ অভিযোজন না হলে লাখো মানুষ পুনরায় দারিদ্র্যের ফাঁদে পড়তে পারে।

এসডিজি অর্জনে জলবায়ু সহনশীলতাকে সব উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ, নগর বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, বন ও জলাভূমি সংরক্ষণ এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি ও আবাসনে বিনিয়োগ বাড়ানো অপরিহার্য। অঞ্চলভিত্তিক ও কমিউনিটি-নির্ভর অভিযোজন কৌশল বিশেষভাবে জরুরি।

৫. টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর উন্নয়ন (SDG 11)

দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোতে যানজট, দূষণ, আবাসন সংকট ও বস্তিবাসীর সংখ্যা বাড়ছে। গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্য কমলেও শহরে দারিদ্র্য বাড়ছে, যা একটি নতুন সামাজিক চ্যালেঞ্জ।

আগামী পাঁচ বছরে স্থানীয় সরকারকে ক্ষমতায়ন, গণপরিবহন উন্নয়ন, সাশ্রয়ী আবাসন ও বস্তিবাসীদের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে। স্মার্ট নগর পরিকল্পনা ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা এসডিজি ১১ অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

৬. সুশাসন, প্রতিষ্ঠান ও তথ্য ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ (SDG 16)

প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব,  গণতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি এবং তথ্য ঘাটতি এসডিজি বাস্তবায়নকে ধীর করে দিচ্ছে। অনেক সূচকের ক্ষেত্রে হালনাগাদ তথ্যের অভাবে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ছে।

সুশাসন নিশ্চিত করতে ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, জবাবদিহিতা এবং জনসেবার দক্ষতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থা ও স্থানীয় পর্যায়ে এসডিজি পর্যবেক্ষণ জোরদার করা জরুরি।

৭. অর্থায়ন ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব জোরদার করা (SDG 17)

এসডিজি অর্জনে বিপুল অর্থের প্রয়োজন, অথচ কর-জিডিপি অনুপাত কম এবং এলডিসি উত্তরণের পর বৈদেশিক সহায়তা হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, কর ব্যবস্থার সংস্কার এবং দায়িত্বশীল বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ অপরিহার্য। উন্নয়ন সহযোগী, বহুপাক্ষিক সংস্থা, এনজিও ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব এসডিজি অর্থায়নের ঘাটতি পূরণে সহায়ক হবে।

উপসংহার

বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আগামী পাঁচ বছরই নির্ধারণ করবে দেশটি ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারবে কি না। কর্মসংস্থানভিত্তিক প্রবৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় দৃঢ় পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

সঠিক নীতি, সমন্বিত উদ্যোগ ও শক্তিশালী অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখনো এসডিজি লক্ষ্যমাত্রার বড় অংশ অর্জন করতে পারে এবং ২০৩০ পরবর্তী সময়ে একটি আরও ন্যায়ভিত্তিক ও সহনশীল রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

লেখক,

ড. না. আদদ্বীন, 

অধ্যাপক ও গবেষক 

Email: opunasir@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *